প্রিন্ট এর তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬
স্থানীয় সরকারে নারী নেতৃত্ব: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে সম্ভাবনার পথে
||
স্থানীয় সরকারে নারী নেতৃত্ব: চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে সম্ভাবনার পথেসেজুতি হোসাইনবাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন—এসব প্রতিষ্ঠানই জনগণের সবচেয়ে কাছাকাছি থেকে সেবা প্রদান করে। তাই এই স্তরে নারীর কার্যকর নেতৃত্ব শুধু নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নয়; এটি সুশাসন, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।গত কয়েক দশকে স্থানীয় সরকারে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে অনেক নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছেন, আবার অনেকে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমেও নেতৃত্বে আসছেন। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে বাস্তবতা হলো, নির্বাচিত হওয়ার পরও অনেক নারী প্রতিনিধি তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ক্ষেত্রে নানামুখী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন।প্রথমত, সামাজিক মানসিকতা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের সমাজের অনেকেই নেতৃত্বকে পুরুষের স্বাভাবিক ভূমিকা হিসেবে দেখেন। ফলে একজন নারী জনপ্রতিনিধিকে প্রায়ই নিজের যোগ্যতার চেয়ে বেশি প্রমাণ দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরুৎসাহিত করা হয় অথবা তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাও কম নয়। অনেক নারী প্রতিনিধি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক সহায়তা কিংবা নীতিগত সমর্থন পান না। কোথাও কোথাও তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ কমিটি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয়। ফলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং জনসংযোগ বজায় রাখতে আর্থিক সামর্থ্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক নারী প্রার্থী পুরুষদের তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকেন। এর ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক সম্ভাবনাময় নারী নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার সুযোগ হারিয়ে ফেলেন।এছাড়া রাজনৈতিক সহিংসতা, সামাজিক হয়রানি এবং বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক অপপ্রচারও নারী নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কিংবা চরিত্রহননের চেষ্টা অনেক নারীকে জনজীবনে সক্রিয় হওয়ার আগ্রহ থেকে বিরত রাখে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এমন পরিবেশ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।তবে এই চিত্রের মধ্যেও আশার জায়গা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক নারী জনপ্রতিনিধি সততা, দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁদের কাজ প্রমাণ করে যে সুযোগ, সহযোগিতা ও সমান মর্যাদা পেলে নারীরা স্থানীয় সরকার পরিচালনায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।স্থানীয় সরকারে নারী নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নারী প্রতিনিধিদের জন্য নিয়মিত নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা এবং পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে তোলা—এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।নারীর ক্ষমতায়ন কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয় সরকার যত শক্তিশালী হবে, গণতন্ত্রও তত শক্তিশালী হবে। আর সেই শক্তির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে যোগ্য, দক্ষ ও সাহসী নারী নেতৃত্ব।অতএব, নারীদের জন্য কেবল প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি করাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের কার্যকর নেতৃত্ব বিকাশের পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক বাংলাদেশ গঠনে নারী ও পুরুষ—উভয়ের সমান অংশীদারিত্বই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত