প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
যে বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আমাদের সন্তানেরা জীবন দিয়েছে, সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি--
||
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিসমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টতারিখ: ৬ আগস্ট, ২০২৬ যে বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আমাদের সন্তানেরা জীবন দিয়েছে, সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি-- মোঃ কুতুবউদ্দিন ঢাকা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ‘বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হোন’ স্লোগানকে সামনে রেখে আজ (৬ আগস্ট, বৃহস্পতিবার) বিকেল ৪ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের উদ্যোগে ‘জুলাই সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশ শুরুতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ বেদিতে আলোচকবৃন্দ, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন পর্যায়ের আলোকচিত্র এবং শহীদদের স্মৃতি নিয়ে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখেন শহীদ পরিবারের সদস্য এবং উপস্থিত দর্শনার্থীরা। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ-এর সঞ্চালনায় এবং সভাপতি সালমান সিদ্দিকী-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শহীদ শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফের গর্বিত মাতা জারতাজ পারভীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান এবং বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সমন্বয়ক মাসুদ রানা। উদ্বোধনী বক্তব্যে জারতাজ পারভীন বলেন, “একজন শহীদ মা হিসেবে কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া ছিল না। আমরা কোনো অর্থ, পদ বা সুবিধা চাইনি। আমরা শুধু চেয়েছিলাম আমাদের সন্তানদের হত্যার ন্যায়বিচার হোক। কিন্তু আজও আমরা দেখছি বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে, নানা ত্রুটি ও গাফিলতির মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে। একই সঙ্গে জুলাইয়ের আত্মত্যাগ ও আকাঙ্ক্ষাকেও বিভিন্নভাবে বিকৃত ও রাজনৈতিক সুবিধা হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যে বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আমাদের সন্তানেরা জীবন দিয়েছে, সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। আমার ছেলে যদি বেঁচে থাকত, তাহলে আজ হয়তো আপনাদের মাঝেই একজন শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থিত থাকত। আমি দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট-এর প্রতি আহ্বান জানাই— আপনারা যেন জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার থাকেন এবং শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন।" অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বলেন, "জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্য, দমন-পীড়ন, ফ্যাসিবাদ এবং আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সেই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। মতের বহুত্বকে স্বীকার করার পরিবর্তে ভিন্নমতের মানুষকে ‘ইসলাম বিদ্বেষী', ‘নাস্তিক’ ইত্যাদি নানান অপবাদ দিয়ে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, মুক্তচিন্তার মানুষ, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং প্রগতিশীল কণ্ঠস্বরের ওপর ধারাবাহিক হামলা হয়েছে; মাজার, মন্দির ও সাংস্কৃতিক পরিসরও রেহাই পায়নি। একই সঙ্গে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এবং নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। যে অভ্যুত্থান মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার পরিবর্তে আমরা দেখছি ভয়, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার রাজনৈতিক পরিবেশকে পুনরুৎপাদন করা হচ্ছে। এটি শুধু জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাই নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্নেরও সরাসরি অস্বীকার।" মাসুদ রানা তাঁর বক্তব্যে বলেন, "শহীদ পরিবারের যন্ত্রণা আমরা কখনো পুরোপুরি অনুভব করতে পারব না, কিন্তু তাঁদের আহ্বানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা আমাদের কর্তব্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদরা যে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে জীবন দিয়েছেন, সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। দেশের প্রতিটি সংকটে ছাত্র-যুবকরাই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়েছে; আজও সেই দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে। জনগণের করের টাকায় শিক্ষা অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সমাজ ও দেশের প্রতি দায়বোধ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। জুলাই গণহত্যার বিচার কেন বিলম্বিত হচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না এবং দেশের নীতিনির্ধারণ এখনো কেন পুরোনো শোষণমূলক ধারায় পরিচালিত হচ্ছে— এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে। কেবল একটি সরকারের পতন ঘটলেই ফ্যাসিবাদের অবসান হয় না। কারণ ফ্যাসিবাদ কোনো দল আনে না, আজকের দিনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যেকোনো দলই ফ্যাসিবাদ আনতে বাধ্য। একই শোষণমূলক রাষ্ট্রনীতি বহাল থাকলে নতুন রূপে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে। তাই জুলাইয়ের চেতনাকে মুখে নয়; আদর্শ, সংগ্রাম, সংস্কৃতি এবং জনগণের পক্ষে আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে ধারণ করতে হবে।" সভাপতির বক্তব্যে সালমান সিদ্দিকী বলেন, "জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন নির্মিত হয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং আমরা দেখছি, আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পরও রাষ্ট্র ও শিক্ষাঙ্গনে পুরোনো দখলদারিত্বের রাজনীতি নতুন মুখোশে ফিরে আসছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির ক্যাম্পাস ও হল দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। শিক্ষাঙ্গনকে জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের পরিবর্তে আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্র বানানোর এই অপচেষ্টা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা।" তিনি আরো বলেন, "জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতনের আন্দোলন ছিল না, ছিল শোষণ, লুটপাট, বৈষম্য ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান। কিন্তু আজও আমরা দেখছি জনগণের মতামত উপেক্ষা করে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থসংশ্লিষ্ট মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি করা হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ মৌলিক অধিকারগুলোকে বাজারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট বাড়ানোর পরিবর্তে শিক্ষাকে আরো বাণিজ্যিকীকরণ ও কারিগরিকরণের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রের নীতিগত চরিত্রে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি; শুধু শাসকের মুখ বদলেছে।" সবশেষ তিনি বলেন, "জুলাইয়ের চেতনাকে স্মরণ করার অর্থ কেবল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; সেই চেতনাকে বাস্তব রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপ দেওয়া। দখলদারিত্ব, সাম্প্রদায়িকতা, লুটপাট, আধিপত্যবাদ এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত ছাত্র-জনতার শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের সংগঠিত শক্তিই পরিবর্তনের একমাত্র ভরসা। সেই শক্তি গড়ে তোলার দায়িত্ব আজ ছাত্রসমাজের কাঁধেই।" সমাবেশ শেষে একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংগীত পরিবেশন করেন অরূপ রাহী, ওয়ারদা আশরাফ, সমগীত, হুমায়ুন আজম রেওয়াজ, কোরাস ও অনিন্দ্য বিশ্বাস।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত