প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
শনিবার দেশে আসবে ৭ বাংলাদেশির মরদেহ
||
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মরদেহ আগামী শনিবার (২২ আগস্ট) সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে পাঠানো হবে। বৃহস্পতিবার নিহত নয়জনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগছে।
নিহত দুই ভারতীয় নাগরিক সন্দীপ পাসোয়ান ও যোগ নারায়ণ আগরওয়ালের মরদেহ বৃহস্পতিবার তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন সূত্র জানিয়েছে, নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ সরকারি খরচে ২২ আগস্ট দেশে পাঠানো হবে।
এক বিজ্ঞপ্তিতে ডেপুটি হাইকমিশন জানিয়েছে, নিউমার্কেট এলাকার অগ্নিকাণ্ডে যেসব বাংলাদেশি নাগরিকের পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের দেশে ফেরার জন্য বিশেষ ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী থানায় করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কপি লাগবে না।
বৃহস্পতিবার ফরেনসিক পরীক্ষায় আগুন লাগার প্রাথমিক কারণ জানা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হোটেলের তৃতীয় তলার রিসেপশনে থাকা এসির তার বা পোর্টে ত্রুটি ছিল। এসি বসানোর জায়গার একটি অংশ ফুলে গিয়েছিল। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
পরে আগুন অন্য বৈদ্যুতিক তারেও ছড়িয়ে পড়ে। এসি থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত ধোঁয়া দ্রুত পুরো ভবনে ছড়িয়ে যায়। কক্ষগুলো কালো ধোঁয়ায় ভরে গেলে শ্বাসরোধ হয়ে নয়জনের মৃত্যু হয়।
তৃতীয় তলাতেই ছিলেন বাংলাদেশের সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী, শিশুসন্তান ও শ্বশুর। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, আগুন লাগার পর তারা প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। পরে প্যাসেজ থেকে তাদের দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ভারতের ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা ও হোটেলকর্মী সন্দীপ পাসোয়ান ছিলেন রিসেপশনের পাশের একটি কক্ষে। ধোঁয়ায় শ্বাস আটকে তারও মৃত্যু হয়। তার বুকে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
তদন্তে হোটেলটির অবকাঠামো ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের পাঁচতলা ভবনটিতে একাধিক হোটেল ও অতিথিনিবাস হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। ভবনের তৃতীয় তলায় মাত্র ১ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গায় ‘শিখা ইন’ পরিচালিত হতো। ওই জায়গায় শৌচাগারসহ ছিল পাঁচটি ছোট কক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, হোটেলটিতে অগ্নিনিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিধি যথাযথভাবে মানা হয়নি।
ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মির্জা গালিব স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকার হোটেল ও লজগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে কলকাতা পুলিশ। এরই মধ্যে কলিন লেনের সাতটি লজ ও চারটি অতিথিশালায় আপাতত অতিথি রাখা যাবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে।
বুধবার থেকেই বিভিন্ন হোটেল ও লজে সরেজমিন পরিদর্শন করে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। পুরো বিষয় নিয়ে দমকলের মহাপরিচালক অনুজ শর্মাও প্রতিবেদন চেয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বুধবার গভীর রাতে ‘শিখা ইন’-এর লিজগ্রহীতা আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ। এর আগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, এন্টালি থানার মেন মার্কেট এলাকা থেকে আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বাড়ি কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকায়। হোটেলটির পরিচালনা, লিজসংক্রান্ত নথি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তদন্ত করতে গিয়ে তার ভূমিকা সামনে আসে।
তদন্তের স্বার্থে আরও দুই হোটেলকর্মীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের একজন পাশের ‘যাপন’ হোটেলের ব্যবস্থাপক এবং অন্যজন ওই হোটেলের কর্মী। পুলিশ জানিয়েছে, যাপন হোটেলের লিজগ্রহীতাও আবু জাফর। বৃহস্পতিবার তাকে ব্যাংকশাল আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১২ দিনের বিশেষ তদন্ত দল (এসআইটি) হেফাজতে পাঠান।
নিউমার্কেটের অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যুর পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে আবাসিক হোটেল ও অতিথিশালাগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তৎপর হয়েছে রাজ্য সরকার। বুধবার রাতের পর বৃহস্পতিবার শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম, মালদা, উত্তর ২৪ পরগনাসহ বিভিন্ন জেলায় হোটেল ও অতিথিশালায় অভিযান চালানো হয়।
এ ছাড়া নিউমার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হোটেল মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে কলকাতা পুলিশ। বৈঠকে হোটেল পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি হোটেলে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স এবং ডিজি অফিস থেকে দেওয়া পুলিশ লাইসেন্স রাখতে হবে। রেস্তোরাঁ থাকলে ফুড লাইসেন্সও বাধ্যতামূলক। নিজেদের খরচে নিয়মিত ফায়ার অডিট করতে হবে।
রাতে হোটেলে একজন কর্মী বা নাইটগার্ড রাখতে হবে, যিনি সারা রাত জেগে দায়িত্ব পালন করবেন। রাতেও হোটেলের মূল ফটক পুরোপুরি বন্ধ রাখা যাবে না। অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য গেস্ট রেজিস্টার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রতিদিনের অতিথিদের তথ্য ফর্ম বি ও ফর্ম সি-এর মাধ্যমে অনলাইনে জমা দিতে হবে।
নির্ধারিত নথি ছাড়া কোনো অতিথিকে হোটেলে রাখা যাবে না। জরুরি নির্গমনপথের সামনে গাড়ি পার্কিং করা যাবে না। প্রতিটি হোটেলে ফায়ার অ্যালার্ম ও প্যানিক অ্যালার্ম রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি হোটেলে অন্তত একটি জরুরি বহির্গমনপথ তৈরির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে প্রকৌশলীদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) গভীর রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ১৫জি মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি এবং দুজন ভারতীয় নাগরিক।
নিহত বাংলাদেশিরা হলেন আকরাম আলী (৭৪), দেবাশীষ দত্ত (৩৯), আফসানা শিরমিন (২৭), সর্নাশীষ দত্ত (২), বাবু আহমেদ (৩৭), রেবতী সরকার ও এস এম আলিমুজ্জামান।
নিহত দুই ভারতীয় নাগরিক হলেন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা সন্দীপ পাসোয়ান (১৯) এবং শিলিগুড়ির বাসিন্দা যোগ নারায়ণ আগরওয়াল (৬৮)। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত