প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬
রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর উত্তেজনা, প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালাবদ্ধের অভিযোগ
||
রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর উত্তেজনা, প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালাবদ্ধের অভিযোগহাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিভক্তি নিয়ে প্রশ্ন; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিমোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, ক্রাইম রিপোর্টার : মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাশেদা বেগমকে ঘিরে চলমান বিরোধের মধ্যে গত ২০ আগস্ট বিদ্যালয়ে তাঁর প্রবেশের পর উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একপর্যায়ে রাশেদা বেগম ও এক নারী অভিভাবককে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখার অভিযোগও উঠেছে।ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। এ সময় তিনি শিক্ষক মকবুল হোসেনসহ আরও একজন শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে দ্বিতীয় তলার দুটি শ্রেণিকক্ষে যান। সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, তা তিনি শুনতে পাননি বলে জানান ওই প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর মতে, শ্রেণিকক্ষ দুটির সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর শুরুতে পরিস্থিতি স্বাভাবিকই ছিল। পরে শিক্ষক সুমন বিদ্যালয়ের দারোয়ানকে মূল ফটকে তালা দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে তিনি জানান। এতে বিদ্যালয় থেকে কেউ বের হতে না পারে—এমন উদ্দেশ্যের কথা তাঁকে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।এরপর শিক্ষকদের কক্ষে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক বাদলের মধ্যে রাশেদা বেগমের বিদ্যালয়ে প্রবেশ নিয়ে কথা-কাটাকাটি শুরু হয় বলে ওই প্রত্যক্ষদর্শী জানান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি তা থামানোর চেষ্টা করেন। এ সময় শিক্ষক তৈয়ব আলী তাঁকে বাধা দেন এবং তাঁকে উদ্দেশ করে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।ওই সময় বিদ্যালয়ে কোনো অভিভাবক উপস্থিত ছিলেন না দাবি করে প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, পরে কয়েকজন শিক্ষককে অভিভাবকদের ফোন করে দ্রুত বিদ্যালয়ে আসতে বলতে দেখা যায়। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে আশঙ্কায় তিনি বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যান।কিছুক্ষণ পর বিদ্যালয় থেকে ফোন পেয়ে তিনি পুনরায় সেখানে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখতে পান বলে জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশেদা বেগম ও একজন নারী অভিভাবককে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে রাখা হয়েছিল এবং বিদ্যালয়ের একজন নারী কর্মচারীর মাধ্যমে কক্ষটির দরজায় তালা দেওয়া হয়েছিল।তবে কক্ষে তালা দেওয়ার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, কতক্ষণ তাঁদের সেখানে রাখা হয়েছিল এবং ঘটনার সময় সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিভক্তির অভিযোগঘটনার সময় বিদ্যালয়ে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী জানান। তাঁর দাবি, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অবস্থান দেখা যায়। একদল বর্তমান প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমানের পক্ষে, আরেকদল রাশেদা বেগমের পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্য একটি অংশ কোনো পক্ষেই ছিল না বলে জানান তিনি।শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি বলে তাঁর দাবি।এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে—শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন বিভক্তি কীভাবে তৈরি হলো এবং কোনো পক্ষের বাইরে থেকে কেউ তাদের প্রভাবিত বা সংগঠিত করেছে কি না।‘টাকা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের’ অভিযোগঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ওই ব্যক্তি দাবি করেন, তাঁর কাছে মনে হয়েছে বিদ্যালয়ের চলমান বিরোধের পেছনে ‘টাকা ও ক্ষমতার লড়াই’ থাকতে পারে।তাঁর অভিযোগ, এই বিরোধের কারণে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে ব্যবহার করা হলে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব তাদের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপর পড়তে পারে।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।আদালতের আদেশের বিষয়েও প্রশ্নরাশেদা বেগমকে গত বছর দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং অন্যান্য অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন।প্রাপ্ত আদালতের নথি অনুযায়ী, বিষয়টি হাইকোর্টে বিচারাধীন এবং পরবর্তী আদেশে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পূর্বের স্থগিতাদেশ বহাল রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে।রাশেদা বেগমের পক্ষ থেকে আদালতের আদেশ সংশ্লিষ্টদের অবগতির জন্য পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তবে ওই আদেশের পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী।তাঁর মতে, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের বিরোধ বা স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন২০ আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—রাশেদা বেগম বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর শ্রেণিকক্ষ দুটিতে কী আলোচনা হয়েছিল?মূল ফটকে তালা দেওয়ার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন?রাশেদা বেগম ও নারী অভিভাবককে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে তালাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল?শিক্ষকদের মধ্যে উত্তেজনার কারণ কী ছিল?শিক্ষার্থীদের মধ্যে পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান কীভাবে তৈরি হলো?কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত বা সংগঠিত করেছিল কি না?অভিযোগ করা ‘টাকা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের’ পেছনে বাস্তবে কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক স্বার্থ রয়েছে কি না?এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সিসিটিভি ফুটেজ, অডিও-ভিডিও রেকর্ড, বিদ্যালয়ের নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজনঘটনাটি নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো এখনো সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। তাই অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাশেদা বেগম, বর্তমান বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী, অভিভাবক এবং অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। তাই ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত