বাংলাদেশের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা-পদ্মা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। চুক্তিটি নবায়নের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের পানিসম্পদ, বন্দর ও শিল্প খাতের স্বার্থ যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। রাজ্যের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংস্থা পিটিআই।
সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ কমিটির বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরা বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন। বৈঠকে পানীয় জল ও শিল্প খাতের জন্য গঙ্গার পানির চাহিদা তুলে ধরে একটি বিশদ প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়।
পিটিআইকে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের প্রধান উদ্বেগ হলো, নবায়িত কোনো চুক্তিতে যেন রাজ্যের ন্যায্য প্রয়োজনীয়তাগুলো পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত থাকে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ভাগীরথী-হুগলি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া অত্যন্ত জরুরি।’ তিনি জানান, রাজ্য সরকার ফারাক্কা ব্যারেজ হয়ে ভাগীরথী-হুগলি নদী ব্যবস্থায় শুষ্ক মৌসুমে পানির পর্যাপ্ত প্রবাহ বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
হুগলি নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ফলে নৌচলাচলে মারাত্মক নাব্যতা সংকট তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজের উজান ও ভাটি—উভয় অংশের মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং নদীয়া জেলার এক বিশাল এলাকা প্রতি বছর নদীভাঙনের কবলে পড়ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়া এবং পলি জমার প্রভাব কেবল নদী ব্যবস্থার ওপরই পড়ছে না, বরং নৌচলাচল ও বন্দরের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যৎ পানিবণ্টন সংক্রান্ত আলোচনার সময় এই বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত পলি জমার কারণে এলাকায় বারবার বন্যা দেখা দিচ্ছে এবং কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্টে জাহাজ চলাচলেও তা বাধা সৃষ্টি করছে।
এর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়া এবং আর্সেনিক দূষণের মতো ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘রাজ্যের জন্য গঙ্গার পানি ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে। শোধনের পর খাবার পানি সরবরাহ, সেচকাজ এবং নির্দিষ্ট কিছু শিল্পকারখানার চাহিদা পূরণে গঙ্গার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তাই ভবিষ্যৎ যেকোনো পানিবণ্টন চুক্তিতে এসব বাড়তি চাহিদার পাশাপাশি পরিবেশগত উদ্বেগগুলোকেও বিবেচনায় রাখতে হবে।’
বর্তমানে ভারতে গঙ্গার পানি সেচকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তা পরিশোধনের মাধ্যমে পানীয় জল হিসেবে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পানির একটি অংশ শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্যও দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন সংক্রান্ত যেকোনো নতুন চুক্তিতে পরিবেশগত ঝুঁকি, নদীভাঙন এবং ভাটির অঞ্চলে পানির পর্যাপ্ত প্রবাহ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।