গ্যাস-সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও দুই দিনের সরকারি ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের অন্যতম বড় শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কারখানায় ৩–৪ দিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী—গাজীপুরের প্রায় ২০-২২ শতাংশ কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার কারখানার ছুটি যোগ করার ফলে সাপ্তাহিক শুক্রবার, শনিবার পর্যন্ত এই ছুটি সমন্বয় করেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ।
এ দিকে ছুটি ঘোষণার পর থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে আজ বুধবার বিকেল পর্যন্ত ঢাকা—ময়মনসিংহ ও ঢাকা—টাঙ্গাইল মহাসড়কের শ্রমিকদের ঈদের সময় বাড়ি ফেরার মতো ভিড় লক্ষ করা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে কয়েক হাজার তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, ওয়াশিং, সিরামিক, ওষুধ, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অনেক কারখানাই সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, টানা তিন দিনের ছুটি পেয়ে বুধবার গাজীপুরের ঢাকা—ময়মনসিংহ ও ঢাকা—টাঙ্গাইল মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, চন্দ্রা ত্রিমোড়, সফিপুর, কোনাবাড়ী, শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন সড়কে ঘরমুখো শ্রমিক ভিড়। পরিবহন সংকটের কারণে অনেক শ্রমিক বৃষ্টিতে ভিজে অপেক্ষা করছেন। ফলে হঠাৎ সড়কে বেড়ে যায় যানবাহনও। যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় রুটে চলাচলকারী বাস–পরিবহনগুলোও দূরপাল্লায় যাত্রা শুরু করেছে। এমনকি সিএনজিচালিত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাযোগেও গন্তব্যে রওনা দিয়েছে মানুষ। একই সঙ্গে চাহিদা বেড়ে যাওয়া ও পরিবহন সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) এসএম আশরাফুল আলম জানান, মঙ্গলবার বিকেল থেকেই ঢাকা—টাঙ্গাইল, ঢাকা—ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট শুরু হয়। বিকেল ৫টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত মহাসড়কে গাড়ির লম্বা লাইন ছিল। বুধবার ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত যাত্রী ও যানবাহনের চাপ ছিল।
কোনাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক জাফর আলী বলেন, জেলার অনেক কারখানায় সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে চার দিনের ছুটি দিয়েছে। এই ছুটি পেয়ে শ্রমিকেরা গ্রামের পথে ছুটে যাচ্ছেন। যার কারণে গত রাত থেকে ঢাকা—টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যানবাহনের বেশ চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকালেও চন্দ্রা এলাকায় শত শত মানুষ ও যানবাহনের ভিড়ে থেমে থেমে যানবাহন চলাচল করছে।
তবে শ্রমিকদের একাংশ অতিরিক্ত ছুটি পেলেও শিল্পমালিকেরা বলছেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো রপ্তানি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন তারা।
বিভিন্ন কারাখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস—সংকট এখন এখন আরও বেড়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে টানা বন্ধ না রেখে উৎপাদন সচল রাখতে মাঝে মাঝেই কারখানার এক–দুই ঘণ্টা কাজ বন্ধ রেখে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন শিল্পকারখানার মালিকেরা। কোথাও কিছু উৎপাদন লাইন বন্ধ রাখা, কোথাও মেশিনের সংখ্যা কমিয়ে চালানো, আবার কোথাও রাতের শিফটে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল।
মহানগরের আমবাগ এলাকার তাপস পিএন কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাপস কুমার তালুকদার বলেন, ‘গ্যাস-সংকটের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু গার্মেন্টস শাখায় ছুটি দেওয়া হয়েছে। তবে টেক্সটাইল খোলা রয়েছে। বুধবার সরকারি ছুটি আর বৃহস্পতিবার ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার ছুটির দিনে এই বৃহস্পতিবারের কাজ আগে করিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
গাজীপুর তিতাস কর্তৃপক্ষ জানায়, গাজীপুরে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতির কারণেই শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনীয় চাপ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
গাজীপুরে তিতাস গ্যাসের সিস্টেম অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার ব্যবস্থাপক মো. সাইফুজ্জামান বলেন, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো। গ্যাস—সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় কাজ চলমান রয়েছে।
কোনাবাড়ী এলাকার পিএন কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপক তাপস পাল বলেন, গ্যাস—সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের সুপার (এসপি) মো. আমজাদ হোসেন জানান, বুধবার ও শুক্রবার ছুটি থাকার কারণে মাঝখানে বৃহস্পতিবার খোলা না রেখে প্রায় ২০ শতাংশ কারখানা ওই দিন ছুটি দেওয়ায় শ্রমিকেরা তিন দিনের টানা ছুটি পেয়েছে।
এসপি আমজাদ আরও জানান, বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গাজীপুরের সড়ক—মহাসড়কে ঘরমুখো শ্রমিকদের চাপ পড়েছিল। কারখানায় গ্যাসের চাপ কম, কাঁচামাল সংকট, অর্ডার কম, সরকারি ও সাপ্তাহিক ছুটি সব মিলিয়ে এসব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গাজীপুরের উপমহাপরিদর্শক প্রকৌশলী এম এম মামুন-অর-রশিদ বলেন, ‘কোনো কোনো কারখানায় ৩ দিন, আবার কোনো কারখানায় ৪ দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০-২২ শতাংশ কারখানা ছুটি দিয়েছে।’