ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে মব সৃষ্টি করে এক শিক্ষককে গণপিটুনীর ঘটনা ঘটেছে। পরে ওই শিক্ষককের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে স্থানীয়রা। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে বড় বাইসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে থানায় গিয়ে ওই শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্স ও পরে জরুরি চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠিয়েছে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় জেলা জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
পরে খবর পেয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ওই স্কুলের অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক শাহ আলম ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে বলে গত সোমবার স্কুল কমিটির এক সদস্য প্রধান শিক্ষককে মোবাইল ফোনে জানায়। পরে প্রধান শিক্ষক ওই ছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন। এসময় প্রধান শিক্ষককে ওই ছাত্রীর মা জানায়, স্কুলের সহকারী শিক্ষক শাহ আলম গত দুই সপ্তাহ ধরে তার মেয়েকে দুপুরে খাওয়ার জন্য ১০ টাকা করে দেন। সোমবার শিক্ষক শাহ আলম নিজের হাতে ‘ওয়াশরুমে যাও’ লিখে ওই ছাত্রীকে দেখায়। লেখাটি দেখে ওই ছাত্রী বাড়িতে চলে যায়। পরে সে তার মা-বাবাকে জানায়, শিক্ষক শাহ আলম তাকে নানা ভাবে হয়রানি করে।
এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, আমি ওই ছাত্রীর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে এ ঘটনায় যথাযথ বিচারের আশ্বাস দিয়ে স্কুলে আসি। অফিসে প্রবেশ করার দু-চার মিনিটের মধ্যেই ওই ছাত্রীর চাচা সৌরভ সরকার, বাবু সহ ১০/১২ জন বহিরাগত লোকজন সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে বেধড়ক মারধর করে। এসময় আমরা শিক্ষক শাহ আলমকে উদ্ধার করে বহিরাগতদের স্কুলের অফিস থেকে বাইরে বের করে দেই। পরে হামলাকারীরা স্কুলের সামনে অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় হামলার চেষ্টা চালায়।
তিনি বলেন, সহকারী শিক্ষক শাহ আলমের নামে আমরা এরকম কোনো অভিযোগ আগে শুনিনি। তিনি পিটিআই ট্রেনিং শেষ করে তিন মাস হলো স্কুলে যোগদান করেছেন। কোনো শিক্ষার্থী এর আগে এ ধরণের অভিযোগ করেনি। শিক্ষকের নামে এরকম অভিযোগ আমাদের সবাইকে হতবাক করেছে।
এদিকে ঘটনার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে সাদা কাগজে হাতে লেখা একটি চিঠি দেয় স্থানীয়রা। ওই চিঠি ভুক্তভোগী শিশুর অভিযোগপত্র হিসেবে শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে দেওয়া হয়।
হাতে লেখা স্বাক্ষরবিহীন ওই সাদা কাগজের চিঠিতে দাবিতে দাবি করা হয়েছে, আমি..... , শাহ আলম স্যার অনেক ধরে বাজে ভাবে গায়ে হাত দেয়। প্রতিদিন ১০ টাকা করে দেয় খাবার খেতে। এভাবে ২ সপ্তাহ দিয়েছে। কাল স্যার তার হাতে লিখেছে ওয়াশরুমে যাও। এটা বলে আমাকে দেখিয়েছে। কিন্তু আমি ভয় পেয়ে ওয়াশরুমে না গিয়ে স্কুল থেকে পালিয়ে বাড়ি চলে আসছি। শুধু আমার না, আমার আরও সহপাঠিদের সাথে স্যার এমন ব্যবহার করে।
এদিকে স্বাক্ষরবিহীন রহস্যজনক ওই চিঠি নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। আবেদনটি কোন বরাবর দেওয়া হচ্ছে, সেটিও চিঠিতে উল্লেখ করা নেই। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীর হাতে লেখা চিঠির শব্দচয়ন, বর্ণ বিন্যাস নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে সমালোচনা। এ নিয়ে জেলার সচেতন মহল ও শিক্ষক, শিক্ষার্থীরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সুখদেব বিশ্বাস বলেন, ব্যক্তিগত কাজে থাকার কারণে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আমি ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাড়িতে যেতে পারিনি। তবে অন্যান্যদের মুখে আমি শুনেছি, সহকারী শিক্ষক শাহ আলম ওই ছাত্রীকে ওয়াশরুমে যেতে বলে। ওই ছাত্রী ওয়াশরুমে গেলে শিক্ষক তার গায়ে হাত দেয়। পরে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ওই শিক্ষককে মারধর করে।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সুখবেদ বিশ্বাস বলেন, শিক্ষককে মারধর করার পরে আমি বিভিন্ন লোকের মুখে শুনেছি যে, ওই ছাত্রীকে হয়তো ওয়াশরুমে নিয়ে গায়ে হাত দিয়েছে। আমি এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না।
এ ঘটনায় শিক্ষকের ওপর হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া সৌরভ সরকার বলেন, ওই শিক্ষক আমার ভাতিজির গায়ে হাত দিয়েছে বলে আমার ভাবির কাছে শুনেছি। পরদিন সকালে আমরা স্কুলে যাই। পরে স্থানীয় জনগণ ওই শিক্ষককে মারধর করে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক শাহ আলম বলেন, আমি স্কুলে এসে হঠাৎ শুনি আমি নাকি এরকম একটি কাজ করেছি। পরে প্রধান শিক্ষক স্যার ওই ছাত্রীর বাড়িতে যান বিস্তারিত জানার জন্য। প্রধান শিক্ষক স্কুলে ফিরে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই ১০/১২ জন আমাকে বেধড়ক মারধর করে। আমি একজন শিক্ষক, আমি কিভাবে আমার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করব, এটাই আমি ভেবে পাচ্ছি না। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক। কেউ আমার বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ করবে আমি ভাবতেও পারিনা।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার ওসি কবির হোসনে বলেন, স্থানীয়রা ওই শিক্ষককে স্কুলে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমরা তাকে থানা হেফাজতে নিয়ে আসি। এরপরই ওই শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ইসিজি করানো হয়। পরে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
jwARI.fetch( $( "#ari-image-jw6a8542e4a249c" ) );
এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান ওসি।
কালীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, শিক্ষককে মারধর ও অবরুদ্ধ করার ঘটনায় আমাকে জানায় থানার ওসি। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি ওই শিক্ষক ১০/১২ জন মিলে মারধর করেছে। স্থানীয়রা ওই সময় অভিযোগ করে যে, এক ছাত্রীকে ওই শিক্ষক নিপীড়ন করেছে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগটি আমরা তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছি।