হাফিজা খাতুনে প্রশ্নবিদ্ধ তৈয়ব-আফরোজার নিয়োগ সনদ জালিয়াতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি, শ্যামলীর দীর্ঘ বিদেশ অবস্থানেও প্রশ্ন
মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী ক্রাইম রিপোর্টার, মৌলভীবাজার: কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষার্থী আন্দোলন, পরীক্ষা তদারকি ও শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে একাধিক অভিযোগ—শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুদকের তদন্ত চান অভিভাবকরা। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও নানা অভিযোগ এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার নিয়োগ, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, কোচিং কার্যক্রম, দায়িত্ব পালনের ধরন এবং বিদেশে অবস্থানকালে ছুটি ও বেতন-ভাতা গ্রহণ নিয়ে উঠেছে একাধিক প্রশ্ন।বিশেষ করে শিক্ষক মোঃ তৈয়ব আলী মীরের নিয়োগের সময়কার যোগ্যতা ও পরবর্তী সময়ে অর্জিত একটি সনদ, শিক্ষক আফরোজা খাতুনের নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিল কি না, এবং শিক্ষক শ্যামলী রানী চন্দ্রের দীর্ঘ সময় কানাডায় অবস্থানকালে ছুটি, হাজিরা ও বেতন-ভাতা গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে নথিনির্ভর তদন্তের দাবি উঠেছেএর পাশাপাশি বিদ্যালয়ে কথিত কোচিং বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অর্থ ও কোচিং সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ, ২০ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এবং ২০২৪ সালের পরীক্ষায় দায়িত্ব পালনের বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক অভিভাবক।অভিভাবকদের দাবি—অভিযোগের পেছনে কারও ব্যক্তিগত বিরোধ বা পক্ষপাত নয়, সরকারি নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড, আর্থিক হিসাব ও প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক।তৈয়ব আলীর নিয়োগে ২০১২ ও ২০১৮ সালের সনদ নিয়ে প্রশ্নবিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ তৈয়ব আলী মীরের নিয়োগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি নিয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, তৈয়ব আলী মীরের নিয়োগ ২০১২ সালে হলেও সংশ্লিষ্ট একটি লাইব্রেরি-সংক্রান্ত সনদ তিনি ২০১৮ সালে অর্জন করেন।এই তথ্য নথিপত্রে সত্য হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—২০১২ সালে নিয়োগের সময় তিনি সংশ্লিষ্ট পদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা কীভাবে পূরণ করেছিলেন?তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি—কোনো শিক্ষক নিয়োগের কয়েক বছর পর কোনো অতিরিক্ত সনদ অর্জন করেছেন, এ তথ্য একাই তাঁর নিয়োগ অবৈধ কিংবা সনদ জাল প্রমাণ করে না। কারণ নিয়োগের সময় তিনি অন্য কোনো স্বীকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা পূরণ করেছিলেন কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।তাই প্রকৃত সত্য জানতে ২০১২ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগের যোগ্যতার শর্ত, তৈয়ব আলী মীরের আবেদনপত্র, নিয়োগের সময় দাখিল করা শিক্ষাগত সনদ, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সনদ যাচাইয়ের নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।আর যদি তাঁর বিরুদ্ধে সনদ জালিয়াতির অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সংশ্লিষ্ট সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের মূল রেকর্ডের সঙ্গে সনদটি মিলিয়ে দেখা।সনদ আসল না জাল—এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য বা কারও মৌখিক দাবি নয়, সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সরকারি রেকর্ডই হতে পারে চূড়ান্ত প্রমাণ।আফরোজার নিয়োগেও সনদ যাচাইয়ের দাবিবিদ্যালয়ের শিক্ষক আফরোজা খাতুনের নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর নিয়োগের সময়কার বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদ ও নম্বরপত্র, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী, নিয়োগপত্র এবং যোগদানপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।এ ছাড়া তিনি যে শিক্ষাগত সনদ দিয়ে নিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় বা সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মূল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।সনদে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সেটি কী ধরনের অসঙ্গতি—ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ তথ্য, জাল সনদ, নাকি প্রশাসনিক ভুল—সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার।কারণ ‘সনদ জাল’—এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের যাচাই ছাড়া কাউকে জাল সনদ ব্যবহারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অনুচিত, তেমনি অভিযোগটি তদন্ত ছাড়া ফেলে রাখাও সমীচীন নয়।কোচিং বাণিজ্য ঘিরেই কি বিরোধের সূত্রপাত?বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের পেছনে কোচিং কার্যক্রম নিয়ে মতবিরোধের বিষয়টিও উঠে এসেছে।সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোচিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে বিরোধ তীব্র হয়।এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন অভিযোগে মোঃ তৈয়ব আলী মীর, আফরোজা খাতুন, শ্যামলী রানী চন্দ্র ও সারওয়ার হোসেন বাদলের নাম এসেছে।তবে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা অবৈধভাবে কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।কারা কোচিং করিয়েছেন, কোথায় করিয়েছেন, তাঁদের কাছে বিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষার্থী পড়েছে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, কোনো রসিদ দেওয়া হয়েছে কি না, কোনো কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তাঁদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।প্রয়োজনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্য, কোচিংয়ের রসিদ, মোবাইল লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথিও পরীক্ষা করা যেতে পারে।শিক্ষার্থী আন্দোলনে ৫০০ টাকা ও এক মাসের কোচিং ফ্রি দেওয়ার অভিযোগবিদ্যালয়কে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো শিক্ষার্থী আন্দোলনে অর্থ ও কোচিং সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ।সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের দাবি, কিছু শিক্ষার্থীকে নগদ ৫০০ টাকা এবং এক মাসের কোচিং ফি মওকুফের সুবিধা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল।এ ছাড়া একজন শিক্ষার্থীকে বিশেষ সুবিধা এবং বিদ্যালয়ে অবস্থানকারী একজন বহিরাগত নারীকে দৈনিক অর্থ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কারণ কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষা, নিরাপত্তা বা আবেগকে ব্যবহার করে কোনো পক্ষের স্বার্থে আন্দোলন সংগঠিত করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।তবে এসব অভিযোগ এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। সত্যতা যাচাই করতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বক্তব্যের পাশাপাশি ভিডিও ফুটেজ, অডিও রেকর্ড, মোবাইল ফোনের বার্তা, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।শিক্ষার্থীরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ না করে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে বক্তব্য নেওয়া উচিত।২০ আগস্টের ঘটনা—সিসিটিভিতে কী আছে?গত ২০ আগস্ট বিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে।ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যেও রয়েছে পার্থক্য। ফলে কে কী করেছেন, কখন করেছেন এবং ঘটনাটির সূত্রপাত কীভাবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।এ ক্ষেত্রে ওই দিনের সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।বিদ্যালয়ের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, করিডোর, অফিস, শ্রেণিকক্ষের আশপাশসহ যেখানে ক্যামেরা ছিল, সেসব স্থানের ফুটেজ সংরক্ষণ ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।এর পাশাপাশি ঘটনাস্থলে থাকা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নেওয়া হলে ঘটনার একটি নিরপেক্ষ টাইমলাইন তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।কোনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পাদিত বা খণ্ডিত আকারে ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ না করে মূল ভিডিও সংরক্ষণ ও যাচাই করাও জরুরি।২০২৪ সালের পরীক্ষা তদারকিতেও প্রশ্ন২০২৪ সালের কোনো কোনো পরীক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন শিক্ষক পরীক্ষার হলে দায়িত্ব পালন না করে অফিসকক্ষে অবস্থান করেছিলেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণে অনুমানের প্রয়োজন নেই। বিদ্যালয়ের নথিতেই এর উত্তর পাওয়া সম্ভব।পরীক্ষার দায়িত্ব বণ্টনের তালিকা, দায়িত্ব পালনের রেজিস্টার, পরীক্ষার সময়কার উপস্থিতির নথি এবং সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।অভিযোগ সত্য হলে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন; আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও পরিষ্কার হওয়া উচিত।কানাডায় দীর্ঘ অবস্থান, বেতন-ভাতা নিয়ে প্রশ্নশিক্ষিকা শ্যামলী রানী চন্দ্রের প্রায় নয় মাস কানাডায় অবস্থানের বিষয়টিও স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে।অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘ সময় কানাডায় অবস্থান করলেও বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিদেশে অবস্থান করলেই বেতন গ্রহণ অনিয়ম হয়ে যায় না। কোনো শিক্ষক অনুমোদিত ছুটি, প্রেষণ বা বিধিসম্মত অন্য কোনো ব্যবস্থায় বিদেশে অবস্থান করলে নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বেতন-ভাতা পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।তাই প্রকৃত প্রশ্ন হলো—শ্যামলী রানী চন্দ্র ওই সময়ে কোন ধরনের ছুটিতে ছিলেন, ছুটি কে অনুমোদন করেছিলেন, তাঁর বিদেশে যাওয়া ও ফেরার তারিখ কী, হাজিরা কীভাবে দেখানো হয়েছে এবং বেতন-ভাতা কোন বিধির ভিত্তিতে প্রদান করা হয়েছে।এসব যাচাই করতে তাঁর বিদেশে যাওয়া ও ফেরার তারিখ, ছুটির আবেদন ও অনুমোদনপত্র, হাজিরা রেজিস্টার, বেতন বিল, ব্যাংক/ইএফটি রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।রাজনৈতিক যোগাযোগ মানেই ষড়যন্ত্র নয়তৈয়ব আলী মীরের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে ছবি থাকা, কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ থাকা—এগুলো একাই কোনো অপরাধ, ষড়যন্ত্র বা বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়।তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ, আন্দোলন সংগঠিত করা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে তা প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ছবি বা ভিডিওকে প্রাথমিক সূত্র হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণের আগে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগসূত্র প্রমাণ করা জরুরি।অভিভাবকদের লিখিত অভিযোগ, ব্যবস্থা কোথায়?অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকার আচরণ, কথিত অনিয়ম, কোচিং কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক অভিভাবক জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।অভিভাবকদের অভিযোগ—এসব লিখিত অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।তাঁদের প্রশ্ন, বিদ্যালয়ের কোনো এক পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি তদন্তের আওতায় আনা হলে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে দেওয়া লিখিত অভিযোগও কি একই মানদণ্ডে তদন্ত করা হবে না?অভিভাবকদের বক্তব্য, তাঁরা কারও বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা চান না। তাঁরা চান, যে অভিযোগ সত্য, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং যে অভিযোগ মিথ্যা, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হোক।বক্তব্যঅভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোঃ তৈয়ব আলী মীরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন।শিক্ষিকা আফরোজা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।শ্যামলী রানী চন্দ্র দেশের বাইরে অবস্থান করায় তাঁর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।অন্যদিকে শিক্ষক সারওয়ার হোসেন বাদল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড বা টিফিন ফান্ডে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা শুধু একজনের একক সিদ্ধান্তে করা সম্ভব নয় বলেও তিনি দাবি করেন। ২০ আগস্টের ঘটনা নিয়েও তিনি নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুদকের তদন্ত দাবিহাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়কে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় এখন স্থানীয়ভাবে শুধু অভ্যন্তরীণ তদন্ত নয়, উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ ও নথিনির্ভর তদন্তের দাবি উঠেছে।অভিভাবকদের দাবি, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে যাচাই করা হোক।বিশেষ করে—তৈয়ব আলী মীরের ২০১২ সালের নিয়োগের সময়কার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পরবর্তী সময়ে অর্জিত কথিত সনদ,আফরোজা খাতুনের নিয়োগের সময়কার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সনদ,শ্যামলী রানী চন্দ্রের দীর্ঘ বিদেশ অবস্থানকালে অনুমোদিত ছুটি, হাজিরা ও বেতন-ভাতা,বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোচিং কার্যক্রম,শিক্ষার্থী আন্দোলনে অর্থ ও কোচিং সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ,২০ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ,এবং২০২৪ সালের পরীক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনের বিষয়—এসবই তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা।তাঁদের মতে, তদন্তকারী সংস্থার উচিত শুধু অভিযোগকারীদের বক্তব্য নয়, অভিযুক্তদের বক্তব্য, সরকারি নথি, আর্থিক হিসাব, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল রেকর্ড পরীক্ষা করা।সনদ জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণ হলে ব্যবস্থা, মিথ্যা হলে অব্যাহতিতৈয়ব আলী মীর ও আফরোজা খাতুনের সনদ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ সনদ জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু চাকরির যোগ্যতার প্রশ্ন নয়, বরং সংশ্লিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিষয়ও হতে পারে।আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগের দায়ও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি, সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।একইভাবে শ্যামলী রানী চন্দ্রের বিদেশ অবস্থান নিয়েও অনুমানের ভিত্তিতে তাঁকে অনিয়মকারী বলা যাবে না। তাঁর ছুটি, হাজিরা ও বেতন-ভাতার সরকারি নথিই বলে দেবে তিনি বিধি মেনে বিদেশে ছিলেন কি না।তদন্তের মাধ্যমে সব প্রশ্নের উত্তর চান অভিভাবকরাঅভিভাবকদের বক্তব্য, বিদ্যালয় কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জায়গা নয়। এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গঠনের প্রতিষ্ঠান।তাই শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন, কোচিং কার্যক্রমের বৈধতা, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা—সবকিছুর ক্ষেত্রেই জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।তাঁদের দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত করুক।তদন্তে যদি কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর যদি কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার করা হোক।অভিযোগ নয়, নথিই বলুক শেষ কথাহাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়কে ঘিরে চলমান বিরোধে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে আগেই দোষী সাব্যস্ত করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও কাম্য নয়।তৈয়ব আলী মীরের নিয়োগ ও সনদ, আফরোজা খাতুনের শিক্ষাগত যোগ্যতা, শ্যামলী রানী চন্দ্রের বিদেশ অবস্থান ও বেতন-ভাতা, কোচিং কার্যক্রম, শিক্ষার্থী আন্দোলন, ২০ আগস্টের ঘটনা এবং ২০২৪ সালের পরীক্ষা—প্রতিটি বিষয়েই প্রয়োজন নথি, সাক্ষ্য ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের সমন্বিত যাচাই।কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁকে দায়মুক্তি দেওয়া হোক।অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী বানানো নয়, আবার অভিযোগকে চাপা দেওয়াও নয়—প্রয়োজন সবার জন্য সমান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত।অভিভাবকদের প্রত্যাশা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে এবং প্রয়োজন হলে দুদকও আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগগুলো যাচাই করবে।এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে হেয় করা নয়; বরং হাফিজা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা।